সামরিক হস্তক্ষেপ: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বাঁকবদল

৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
2 min মিনিট পড়া
Paritosh Chakma
 সামরিক হস্তক্ষেপ: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বাঁকবদল

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে সেনাবাহিনী বারবার দেশের রাজনৈতিক ধারাকে প্রভাবিত করেছে। রাষ্ট্রগঠনের অস্থিরতা, দলীয় দ্বন্দ্ব এবং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে সংঘটিত এসব অভ্যুত্থান ও হস্তক্ষেপ গণতন্ত্রের পথে যেমন বাধা তৈরি করেছে, তেমনি নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও দলীয় বিন্যাসও গড়ে তুলেছে। এখানে স্বাধীনতার পর থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি অভ্যুত্থান ও হস্তক্ষেপের সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো।

১. ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থান

স্বাধীনতার মাত্র চার বছর পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। সেনাবাহিনীর একদল কর্মকর্তা এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়, যার ফলে দেশের রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্য পুরোপুরি পাল্টে যায়। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতি হন এবং এখান থেকেই সামরিক শাসনের ভিত্তি তৈরি হয়।

২. ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর পাল্টা অভ্যুত্থান

১৫ আগস্টের ঘটনার পর সেনাবাহিনীর ভেতরে বিভক্তি আরও তীব্র হয়। ৩ নভেম্বর সেনাবাহিনীর একাংশ ক্ষমতা দখল করে এবং জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করে। তবে একই মাসে আরেকটি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ ক্ষমতা নেন। এই ধারাবাহিক অস্থিরতা ও অন্তর্দ্বন্দ্ব রাষ্ট্রব্যবস্থাকে আরও দুর্বল করে তোলে।

৩. ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর: সৈনিক-জনতার অভ্যুত্থান

“সিপাহী-জনতার বিপ্লব” নামে পরিচিত এ ঘটনার মাধ্যমে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান মুক্ত হন এবং দ্রুত ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসেন। এটি ছিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বড় বাঁক ঘোরার মুহূর্ত। পরে তিনি রাষ্ট্রপতি হন এবং বিএনপি গঠনের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক ধারার সূচনা করেন।

৪. ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ: এরশাদের ক্ষমতা দখল

রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারের নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা নেন। প্রায় নয় বছর তিনি সামরিক শাসক হিসেবে দেশ চালান এবং পরে জাতীয় পার্টি গঠন করেন। এরশাদের আমল বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর প্রভাবকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করে।

৫. ২০০৭ সালের সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার

২০০৬ সালের রাজনৈতিক অচলাবস্থা, নির্বাচন কমিশন নিয়ে বিরোধ ও সহিংস পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনী ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পেছনে সক্রিয় ভূমিকা নেয়। দুই বছরের বেশি সময় এই সরকার টিকে থাকে এবং দুর্নীতি বিরোধী অভিযান, রাজনৈতিক সংস্কার, এমনকি শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তারের মতো পদক্ষেপ নেয়। সরাসরি সামরিক শাসন না হলেও, এই হস্তক্ষেপ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ধারাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়।

উপসংহার

স্বাধীনতার পর পঞ্চাশ বছরে সেনা অভ্যুত্থান ও হস্তক্ষেপ বারবার বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ পাল্টেছে। প্রতিটি অভ্যুত্থান শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তনই আনেনি, বরং দলীয় কাঠামো, গণতন্ত্রের চর্চা ও রাষ্ট্রব্যবস্থার স্থিতিশীলতাকেও নাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা হয়েছে খণ্ডিত ও জটিল—যার প্রভাব আজও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে স্পষ্টভাবে বিদ্যমান।

ট্যাগসমূহ

#সামরিকহস্তক্ষেপ#গণতন্ত্র#সামরিকশাসন